ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩

আগামী সপ্তাহে নতুন করে উত্তরাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা

কালের সমাজ ডেস্ক | জুলাই ১৭, ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম আগামী সপ্তাহে নতুন করে  উত্তরাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা
সংগৃহীত ছবি

সাত জেলায় প্রাণহানি ৫৮, ক্ষতিগ্রস্ত ১২ লাখের বেশি মানুষ

টানা ভারী বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং ভয়াবহ পাহাড় ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত সাত জেলায় অন্তত ৫৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১২ লাখ ১৬ হাজার ৮০৫ জন মানুষ।

যদিও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্যাঞ্চল ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, তবে নতুন করে দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে উজানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি বর্তমানে সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে এবং এটি আরও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে।

এর প্রভাবে আগামী কয়েক দিনে দেশের রংপুর, রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং ভারতের আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ ও হিমালয়-পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী সাত দিনে এসব এলাকায় স্থানভেদে ২৫০ থেকে ৩৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে, যা উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বর্তমানে কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে, যদিও সুরমা নদীর পানি কিছুটা কমেছে। কুশিয়ারা নদী সিলেটের মারকুলি ও সিলেট পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

অন্যদিকে সুরমা নদী ছাতক এবং কুশিয়ারা নদী শেরপুর পয়েন্টে সতর্কসীমার কাছাকাছি রয়েছে। তবে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতি বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, আগামী ১৯ থেকে ২৩ জুলাইয়ের মধ্যে উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।

ফলে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, লঘুচাপের প্রভাবে দেশের ওপর মৌসুমি বায়ু সক্রিয় রয়েছে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে তা প্রবল অবস্থায় বিরাজ করছে।

এর ফলে রংপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় এবং রাজশাহী, ঢাকা ও খুলনা বিভাগের কিছু স্থানে দমকা হাওয়াসহ মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে সর্বোচ্চ ২৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা।

এসব জেলার ৫৭টি উপজেলার ৩৬২টি ইউনিয়ন ও আটটি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে ৫২ হাজার ৪৯৩টি পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে এবং অনেক এলাকায় এখনো স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি ফিরেনি।

প্রাণহানির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজার জেলা। সেখানে পাহাড় ধস ও ঢলের পানিতে ভেসে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ২৫ জন আহত হয়েছেন এবং একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

চট্টগ্রামে পাহাড়ি ঢল ও জলাবদ্ধতায় ১৫ জনের মৃত্যু এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। বান্দরবানে সাতজন, রাঙামাটিতে তিনজন এবং মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাত জেলায় ৮৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ৮৪৯ জন মানুষ অবস্থান করছেন। পাশাপাশি দুর্গত এলাকায় খাদ্য ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে চাল, নগদ অর্থ, শুকনা খাবার, শিশুখাদ্য ও গবাদিপশুর খাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা এবং এক হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল, কক্সবাজারে ৪০ লাখ টাকা ও ৪৫০ মেট্রিক টন চাল এবং রাঙামাটিতে ৩০ লাখ টাকা ও ৫০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত জেলাতেও প্রয়োজন অনুযায়ী ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ব্যবস্থাপনা, পাহাড় ধস রোধে কার্যকর পদক্ষেপ, নদী ব্যবস্থাপনা এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি।

বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষকে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে দুর্গত এলাকার মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
কালের সমাজ/এএইচবি 

Link copied!