মানিকগঞ্জ-১ ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয় উপজেলা নিয়ে গঠিত জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন, যার রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার বদলেছে ক্ষমতার সমীকরণ। স্বাধীনতার পর প্রথম ও দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ অঞ্চল ঢাকা-১ আসনের অংশ ছিল এবং ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ এম সায়েদুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন; ১৯৭৯ সালে বিএনপির খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে বিএনপির শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়। ১৯৮৪ সালে মানিকগঞ্জ জেলা প্রতিষ্ঠার পর নির্বাচনী পুনর্বিন্যাসে আসনটি মানিকগঞ্জ-১ হিসেবে পরিচিতি পায় এবং ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান পরপর দুইবার জয়ী হয়ে প্রমাণ করেন, এরশাদ আমলে জাতীয় পার্টিরও এ অঞ্চলে শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান ছিল। এরপর ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেলে মানিকগঞ্জ-১ আবার বিএনপির দখলে যায়।
খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ সালের জুন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে এ আসন থেকে মোট পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন; তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, বিএনপির জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন এবং স্থানীয় পর্যায়ে শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তির কারণে নব্বইয়ের দশক থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মানিকগঞ্জ-১ কার্যত তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৯৯১ সালে তাঁর ভোট ছিল ৪৬ হাজার ৮১৭ এবং ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে তিনি পান ৪৪ হাজার ৫০২ ভোট; ২০০১ সালে তাঁর ভোট বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫ হাজার ৪৪৭। এই ধারাবাহিকতা শুধু বিএনপির নির্বাচনী শক্তিই নয়, একজন প্রভাবশালী নেতার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতারও প্রতিফলন।
কিন্তু ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এই আসনের রাজনীতিতে বড় বাঁক তৈরি করে। আওয়ামী লীগের এ বি এম আনোয়ারুল হক ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩২২ ভোট পেয়ে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে পরাজিত করেন এবং দীর্ঘদিন পর আওয়ামী লীগ আসনটি পুনরুদ্ধার করে। আনোয়ারুল হক ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রকৌশলী; সংসদ সদস্য থাকাকালে তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং জাফরগঞ্জ বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগে ভূমিকা রাখেন। ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়।
আনোয়ারুল হকের পর আওয়ামী লীগের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হয় সাবেক ক্রিকেটার এ এম নাঈমুর রহমান দুর্জয়কে ঘিরে। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে জাতীয় পরিচিতি থাকা দুর্জয় ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে ৮১ হাজার ১২৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন; তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাসদের আফজাল হোসেন খান জোকি পান ১৪ হাজার ৩০০ ভোট। ২০১৮ সালের নির্বাচনে দুর্জয়ের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়; তিনি ২ লাখ ৫১ হাজার ৯৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন, যেখানে বিএনপির খোন্দকার আব্দুল হামিদ ডাবলু পান ৫৬ হাজার ৪৪৭ ভোট। ফলে ২০০৮ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত টানা তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মানিকগঞ্জ-১ আসন ধরে রাখে এবং দুর্জয় হয়ে ওঠেন এ আসনের আওয়ামী লীগের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ।
কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। দুর্জয়ের পরিবর্তে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালামকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত জোটগত সমীকরণে আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জহিরুল আলম রুবেলকে প্রার্থী করা হয়। এখানেই আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নতুন মোড় নেয়। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ জাহিদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঈগল প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন এবং ৮৬ হাজার ৯৪১ ভোট পেয়ে জয়ী হন; তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির জহিরুল আলম রুবেল পান ৩৮ হাজার ৯৪২ ভোট। ২০২৪ সালের ফলাফলের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই যে, আওয়ামী লীগ জোটের স্বার্থে আসনটি জাতীয় পার্টিকে দিলেও আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতির একটি বড় অংশ স্বতন্ত্র প্রার্থী জাহিদের সঙ্গে চলে যায়। অর্থাৎ নৌকা প্রতীক না থাকলেও আওয়ামী লীগের একজন নেতার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সংগঠন ও গ্রহণযোগ্যতা দলীয় প্রতীকের বিকল্প শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে, এমন একটি বার্তা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে জাতীয় পার্টির জন্যও ফলাফলটি ছিল সতর্ক সংকেত; কারণ জোটের সমর্থন পেয়েও দলটি স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়।
আশির দশকে যে জাতীয় পার্টি এ আসনে পরপর দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছিল, কয়েক দশক পর সেই দলকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকতে জোটের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এরপর আসে ২০২৬ সালের নির্বাচন, যা মানিকগঞ্জ-১-এর রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটায়।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ২০২৪ সালের আওয়ামী লীগ বনাম জাতীয় পার্টির সমীকরণ ভেঙে গিয়ে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয় বিএনপি, স্বতন্ত্র ও জামায়াতকে ঘিরে। এ নির্বাচনে বিএনপির এস এ জিন্নাহ কবীর ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. তোজাম্মেল হক পান ৭৭ হাজার ৮১৮ ভোট; আসনটিতে মোট ভোটার ছিল ৪ লাখ ৬১ হাজার ৯৪২ জন, যার মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩১ হাজার ৮৫৭, নারী ২ লাখ ৩০ হাজার ৮১ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন। জিন্নাহ কবীরের জয়কে শুধু একটি নির্বাচনী ফল হিসেবে দেখলে মানিকগঞ্জ-১-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। বিএনপির রাজনীতিতে তাঁর উত্থানও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় তিনি বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খোন্দকার আব্দুল হামিদ ডাবলু দলীয় মনোনয়ন পান এবং আওয়ামী লীগের দুর্জয়ের কাছে পরাজিত হন। পরবর্তী সময়ে জিন্নাহ কবীর জেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং ২০২৬ সালে সেই তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনেই বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। ফলে বিএনপির জন্য এটি একদিকে ২০০৮ সালের পর দীর্ঘ বিরতির অবসান, অন্যদিকে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে নতুন নেতৃত্বের দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত।
তবে ২০২৬ সালের ফলাফলে স্বতন্ত্র প্রার্থী তোজাম্মেল হকের ৭৭ হাজার ৮১৮ ভোট এবং জামায়াতের আবু বকর সিদ্দিকের ৭১ হাজার ৩১০ ভোট পাওয়ার তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে বোঝা যায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকলেও ভোট এককভাবে বিএনপির দিকে যায়নি; বিএনপির পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিরও উল্লেখযোগ্য ভোটভিত্তি তৈরি হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের মানিকগঞ্জ-১-এর রাজনীতি শুধু বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সংগঠন পুনর্গঠন এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা। ২০০৮ সালে আনোয়ারুল হকের হাত ধরে আসন পুনরুদ্ধার, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে দুর্জয়ের টানা জয় এবং ২০২৪ সালে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে জাহিদের স্বতন্ত্র বিজয় আওয়ামী লীগের শক্তি ও দুর্বলতার দুই দিকই প্রকাশ করেছে। দুর্জয়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান, আইনি পরিস্থিতি, দলের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত এবং স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে। অন্যদিকে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিজয়কে স্থায়ী সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ দেওয়া। কারণ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সময়ের ব্যক্তিনির্ভর জনপ্রিয়তা এবং পরবর্তী সময়ে দলীয় সংগঠনের শক্তি মিলিয়ে যে বিএনপি এ আসনে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করেছিল, জিন্নাহ কবীরকে এখন সেই ইতিহাসের নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে হবে।
জাতীয় পার্টির অবস্থান আরও কঠিন; ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের বিজয়ের স্মৃতি থাকলেও ২০২৪ সালে জোটের প্রার্থী হয়েও পরাজয় প্রমাণ করেছে যে পুরোনো ভোটভিত্তি আগের অবস্থানে নেই। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের ফলাফল জামায়াত ও স্বতন্ত্র রাজনীতির সম্ভাবনাকেও সামনে এনেছে। সব মিলিয়ে মানিকগঞ্জ-১-এর প্রায় পাঁচ দশকের ইতিহাস বলে, এ আসন কোনো দলের স্থায়ী দুর্গ নয়; বরং জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তন, স্থানীয় সংগঠন, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, দলীয় মনোনয়ন, বিদ্রোহী প্রার্থীর ভূমিকা এবং ভোটারের পরিবর্তিত মনোভাব এখানে বারবার রাজনৈতিক পালাবদল ঘটিয়েছে।
১৯৭৩ সালের আওয়ামী লীগের সূচনা, ১৯৭৯ সালের বিএনপির উত্থান, আশির দশকে জাতীয় পার্টির দুই জয়, ১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের দীর্ঘ আধিপত্য, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে দুর্জয়ের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ধারাবাহিকতা, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের ঘর থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর উত্থান এবং ২০২৬ সালে বিএনপির প্রত্যাবর্তন একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, মানিকগঞ্জ-১-এ শুধু দল নয়, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনই শেষ পর্যন্ত বড় পার্থক্য তৈরি করে। তাই ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তার উত্তর এখনই চূড়ান্ত নয়। বরং ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয়ের মাঠপর্যায়ের সংগঠন, নতুন নেতৃত্ব, ভোটারদের প্রত্যাশা এবং পরবর্তী নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিবেশই ঠিক করবে মানিকগঞ্জ-১ আবার পুরোনো কোনো রাজনৈতিক ঘাঁটিতে ফিরবে, নাকি আরও একবার নতুন কোনো শক্তির উত্থান দেখবে।
কালের সমাজ/এসআর

