ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

ফুটবল নক্ষত্রের বিদায়

স্পোর্টস ডেস্ক | অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০৯:২৯ এএম ফুটবল নক্ষত্রের বিদায়

একদিন সব গল্পেরই শেষ হয়।
কিছু গল্প শেষ হয়ে যায় নিঃশব্দে, আর কিছু গল্পের শেষ অধ্যায় লিখতে গিয়ে কেঁদে ফেলে পুরো পৃথিবী।

লিওনেল মেসির গল্পটা তেমনই।

আনন্দ ও শান্তির সংজ্ঞা সবার কাছে এক নয়। কারও কাছে তা সুস্থ জীবন, কারও কাছে প্রাচুর্য, আবার কারও কাছে স্বপ্নপূরণের তৃপ্তি। লিওনেল মেসিকে যদি আজ প্রশ্ন করা হয়—শান্তি আর সুখের প্রকৃত অর্থ কী? হয়তো তার উত্তর খুঁজতে খুব বেশি শব্দের প্রয়োজন হবে না। বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলে যে তৃপ্তি নিয়ে মাঠ ছাড়লেন, সেটিই হয়তো তার উত্তর।

মেসির বিদায়ী ম্যাচে পরিবারের প্রায় সবাই ছিলেন তার পাশে। মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিতিনি, স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো এবং তিন সন্তান থিয়াগো, মাতেও ও চিরো ছিলেন গ্যালারিতে। বাবা হোর্হে মেসি অবশ্য পৃথিবীতে নেই; দূর আকাশ থেকেই নিশ্চয়ই দেখেছেন সফল পুত্রের এই বিদায়। আর মেসির শৈশবের প্রিয় দাদি, যাকে গোল করার পর দুই হাত আকাশের দিকে তুলে স্মরণ করেন তিনি, তিনিও যেন ছিলেন এই বিশেষ মুহূর্তের অংশ।

মাত্র ১২ বছর বয়সে রোজারিও ছেড়ে স্পেনে পাড়ি দিয়েছিলেন মেসি। উন্নত চিকিৎসা ও ফুটবলের ভবিষ্যতের আশায় শুরু হয়েছিল সেই যাত্রা। আর্জেন্টিনার ফুটবল কাঠামো যখন তার চিকিৎসার ব্যয় বহনে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল, তখনও জাতীয় দলের হয়ে খেলার স্বপ্ন ছাড়েননি এই ক্ষুদে প্রতিভা।

সময় গড়িয়েছে। সেই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপের মতো বড় বড় শিরোপা। নিজের দেশের মানুষের পাশাপাশি পৃথিবীর কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। তাই বিদায়ের আগে মেসি যখন বললেন, ‘আমি শান্তিতে বিদায় নিচ্ছি। আমি সবকিছু দিয়ে চেষ্টা করেছি’, তখন তার কথায় ছিল দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসার তৃপ্তি।

কিংবদন্তিরও একদিন থামতে হয়। মেসির সেই দিনটি ছিল ৭ অক্টোবর। বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলেই শেষ হলো আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার ২১ বছরের পথচলা।

বিদায়ী ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে নীরবতা ভেঙে নিজের অনুভূতির কথা জানান মেসি। আর্জেন্টিনার মানুষকে উদ্দেশ করে দেওয়া আবেগঘন বার্তায় তিনি বলেন, তিনি শান্তিতেই বিদায় নিচ্ছেন। এর আগে আরেকটি পোস্টে জানিয়েছিলেন, জাতীয় দলের সতীর্থ ও দলকে তিনি মিস করবেন।

তবে মেসি যতটা আর্জেন্টিনাকে মিস করবেন, তাকে হয়তো তার চেয়েও বেশি মিস করবে আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ (২০৮), সর্বোচ্চ গোল (১২৬) ও সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের  (৭০) কীর্তি গড়া এই মহাতারকার আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষ হয়েছে অসংখ্য রেকর্ড সঙ্গে নিয়ে।

শুধু গোল কিংবা অ্যাসিস্ট দিয়ে মেসিকে মূল্যায়ন করা কঠিন। বিশ্বকাপের ইতিহাসেও নিজের জন্য তৈরি করেছেন আলাদা এক অধ্যায়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ (৩৪), গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে সর্বোচ্চ অবদান (৩৩) এবং বিশ্বকাপের সর্বকালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ শট (১৪০), শট অন টার্গেট (৬৪), সুযোগ তৈরি (৯৯) এবং সবচেয়ে বেশি সফল ড্রিবলিংয়ের (২৫০) রেকর্ডে একক সাম্রাজ্য গড়ে বিদায় নিচ্ছেন মেসি।

কিন্তু এই সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পর রিও ডি জেনিরোর সেই বিষণ্ণ রাত আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। এরপর টানা দুই কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়। ২০১৬ সালের সেই হতাশার পর ডাগআউটে বসে মেসির অঝোর কান্নার দৃশ্য কাঁদিয়েছিল পুরো ফুটবল বিশ্বকে।

নিজ দেশের মানুষের সমালোচনাও শুনতে হয়েছিল তাকে। একপর্যায়ে অভিমানে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। কিন্তু সেখানেই শেষ হয়নি গল্প।

মহাকাব্যের নায়কের মতোই ঘুরে দাঁড়ালেন মেসি। ২০২১ সালে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হলো পুনরুত্থানের নতুন অধ্যায়। তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় রূপকথাটি তখনও বাকি।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। ৩৫ বছর বয়সী মেসির কাঁধে তখন কোটি মানুষের প্রত্যাশা। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে অপ্রত্যাশিত হারের পর আর্জেন্টিনা যখন চাপে, তখনই শুরু হয় অবিশ্বাস্য ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

মেক্সিকোর বিপক্ষে দূরপাল্লার দুর্দান্ত গোল, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অসাধারণ পাস, আর ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই—প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে মেসি পৌঁছে যান স্বপ্নের মঞ্চে।

লুসাইল স্টেডিয়ামে টাইব্রেকারের শেষ শটের পর যখন বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনার হাতে, মেসি হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলেন মাঠে। আনন্দে কেঁদেছিল পুরো ফুটবল বিশ্ব। এরপর ঐতিহ্যবাহী কালো ‘বিশত’ পরে হাতে তুলে নিয়েছিলেন সেই বহু প্রতীক্ষিত সোনালি ট্রফি। যে বিশ্বকাপের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছিলেন, অবশেষে সেটিই পূর্ণতা দেয় তার ক্যারিয়ারকে।

সেই বিশ্বকাপ জয়ের পর আর কিছু পাওয়ার বাকি ছিল কি? হয়তো ছিল না। তবুও দেশের হয়ে আরও কিছুদিন খেলেছেন, আরও স্মৃতি তৈরি করেছেন। আর শেষ পর্যন্ত বিদায় নিলেন বীরের মতোই—নিজের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় ফুটবল নক্ষত্র হিসেবে।

একটি যুগের অবসান হলো। আকাশি-সাদা জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠ ছেড়ে গেলেন সেই মানুষটি, যিনি ফুটবলকে শুধু খেলেননি—অসংখ্য মানুষের জীবনে ভালোবাসার একটি ভাষা বানিয়ে দিয়েছেন।

বিদায়, মেসি। বিদায় নক্ষত্র।

Link copied!