ঢাকা শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

যে জেলের জেলার, সেখানেই এখন বন্দি!

কালের সমাজ ডেস্ক | অক্টোবর ১০, ২০২৬, ১১:২৬ এএম যে জেলের জেলার, সেখানেই এখন বন্দি!

স্বামী কর্মসূত্রে থাকেন অন্য শহরে। দুই ছোট মেয়েকে নিয়ে একাই সংসার সামলানোর পাশাপাশি কারাগারের দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছিল তাকে। ঘরের কাজ ও সন্তানদের দেখাশোনার চাপ সামলাতে শেষ পর্যন্ত এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নেন ভারতের রাজস্থানের আজমের সেন্ট্রাল জেলের নারী কারাপাল দিব্যা চৌধুরী।

অভিযোগ, নিজের দুই মেয়ের দেখাশোনা ও বাড়ি পরিষ্কারের কাজে সাহায্য নিতে কারাগার থেকে দুই নারী বন্দিকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টাই তাকে কারাগারের বাসিন্দা বানিয়েছে। যে জেলে একসময় বন্দিদের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন, এখন সেই জেলেই বন্দি রয়েছেন ৩৭ বছর বয়সী এই কর্মকর্তা। খবর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১২ জুলাই আজমের সেন্ট্রাল জেলের নারী সংশোধনাগারে সাজাপ্রাপ্ত কিরণ ওরফে সেথা এবং বিচারাধীন বন্দি সানাকে নিয়ে কারাগার থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন দিব্যা। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সহকর্মী ও বন্ধু হিসেবে পরিচিত নারী কনস্টেবল সোনিয়া চৌধুরী। তবে কারাগারের প্রধান ফটকে দায়িত্বে থাকা অন্য কর্মীরা বাধা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের অভিযোগ, সহকর্মীদের আপত্তি উপেক্ষা করে তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে দুই বন্দিকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন দিব্যা ও সোনিয়া।

রাজস্থানের ভিলওয়ারার বাসিন্দা দিব্যা আজমেরে ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার স্বামীও কারা বিভাগের কর্মকর্তা; তিনি কর্মসূত্রে কোটায় দায়িত্ব পালন করতেন। দুই মেয়েকে নিয়ে আজমেরে বসবাস করতেন দিব্যা। আজমেরের ডেপুটি পুলিশ সুপার শিবম যোশি বলেন, ‘তার মেয়েরা খুব ছোট। তিনি চেয়েছিলেন, ওই দুই বন্দি তার মেয়েদের দেখাশোনা করবে এবং বাড়ি পরিষ্কার করে দেবে।’

পুলিশের দাবি, কারাগার থেকে বের হওয়ার পর বিষয়টি দ্রুত জানাজানি হয়ে যায়। দুই নারী বন্দি বাইরে মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টা ছিলেন। পরে তাদের আবার কারাগারে ফিরিয়ে আনা হয়।

ডেপুটি পুলিশ সুপার শিবম যোশি বলেন, ‘তার কর্মকাণ্ড বেআইনি ছিল। আদালতের সুরক্ষার অধীনে বন্দিদের কারাগারে রাখা হয়। তাই এ ঘটনায় মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করা হয়।’

রাজস্থান প্রিজনস রুলস ২০২২ অনুযায়ী, কারাপালের দায়িত্ব হলো বন্দিদের হেফাজত, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি নিরাপত্তার ঘাটতি কিংবা অন্য কোনো অনিয়ম দেখা দিলে তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানোও তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

ঘটনার পর বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়। তদন্তে দিব্যার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হয়েছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। এরপর আজমের সেন্ট্রাল জেলের প্রহরী মহিপাল মঙ্গলোদার লিখিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ৫ আগস্ট আজমেরের সিভিল লাইনস থানায় মামলা করা হয়। তবে এফআইআর দায়েরের পর গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যান দিব্যা।

তাকে গ্রেপ্তারে সিভিল লাইনস থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শম্ভু সিংয়ের নেতৃত্বে একটি বিশেষ পুলিশ দল গঠন করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিমাংশু জাঙ্গিড ও ডেপুটি পুলিশ সুপার শিবম যোশির তত্ত্বাবধানে দলটি তদন্ত শুরু করে। এতে নিয়মিত পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি সাইবার সেলের কর্মকর্তারাও যুক্ত ছিলেন।

পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য ও ঘটনাস্থল-সংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণ করে দিব্যার অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। শেষ পর্যন্ত গত ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার কোটার একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আজমেরের সিভিল লাইনস থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মইনুদ্দিন জানান, দিব্যাকে তার স্বামীর ভাড়া বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার স্বামী কোটায় কারা বিভাগের কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে পুলিশ যখন ওই ফ্ল্যাটে অভিযান চালায়, তখন তিনি নিজের গ্রামে ছিলেন।

পুলিশের কাছে দেয়া বক্তব্যে দিব্যা দাবি করেছেন, বাড়ি পরিষ্কারের জন্য একজন সহায়তাকারী প্রয়োজন ছিল। এ কারণে অধস্তন কর্মী সোনিয়াকে তিনি মুক্ত কারাগার থেকে নারী বন্দি নিয়ে আসতে বলেছিলেন, কারণ সেখানকার বন্দিরা নির্দিষ্ট নিয়মে বাইরে যাওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু সোনিয়া মুক্ত কারাগারের পরিবর্তে অন্য দুই বন্দিকে নিয়ে আসেন বলে দাবি করেছেন দিব্যা।

তবে পুলিশের বক্তব্য, এখন নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও ঘটনার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

কালের সমাজ/এসআর

Link copied!