ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
কালো টাকা সাদা

করা নিয়ে যা বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান

বিশেষ প্রতিনিধি | জুন ১২, ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম করা নিয়ে যা  বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান
ছবি সংগ্রহ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আবারও ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ’ রাখা হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান দাবি করেছেন, এবারের বাজেটে প্রকৃত অর্থে কালো টাকা সাদা করার কোনো বিধান রাখা হয়নি। বরং জমি, ফ্ল্যাট ও ভবন ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত লেনদেনের অর্থ বৈধভাবে প্রদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

শুক্রবার বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এ বিষয়ে অনেকের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। তার ভাষায়,  এবারের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো প্রভিশন রাখা হয়নি। মূল বিষয়টি হলো সম্পত্তি কেনাবেচার প্রকৃত মূল্য দেখানোর সুযোগ দেওয়া।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে জমি ও ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে প্রকৃত লেনদেনের মূল্য দলিলে উল্লেখ করা মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি ৫ কোটি টাকায় জমি বিক্রি করেন, কিন্তু দলিলে মূল্য দেখানো হয় মাত্র ১ কোটি টাকা, তাহলে বাকি ৪ কোটি টাকার হিসাব নিয়ে তিনি পরবর্তীতে নানা জটিলতায় পড়েন।

এই সমস্যা সমাধানে গত অর্থবছরে বিক্রেতাদের জন্য একটি সুযোগ রাখা হয়েছিল। তারা যদি ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের প্রমাণ, বায়নানামা বা প্রয়োজনীয় দলিলপত্র দেখাতে পারেন, তাহলে নিয়মিত কর এবং মূলধনী মুনাফার ওপর প্রযোজ্য কর পরিশোধ করে সেই অর্থ বৈধভাবে প্রদর্শন করতে পারবেন।

এবার একই ধরনের সুযোগ ক্রেতাদের জন্যও রাখা হয়েছে। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে কেউ প্রকৃতপক্ষে ২০ কোটি টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাট কিনলেও দলিলে মূল্য দেখানো হয় মাত্র ৩ কোটি টাকা। পরে কর কর্তৃপক্ষ প্রকৃত লেনদেনের তথ্য পেলে ক্রেতাকে অতিরিক্ত কর ও জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়।

এনবিআর চেয়ারম্যানের ভাষায়,  ক্রেতারা যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য তাদেরও একটি সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

নতুন বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি জমি, ভবন বা অ্যাপার্টমেন্টের প্রকৃত ক্রয়মূল্য দলিলমূল্যের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে, তাহলে তিনি ওই অতিরিক্ত বা অপ্রদর্শিত অর্থের ওপর নিয়মিত আয়কর হার অনুযায়ী কর পরিশোধ করে তা বৈধভাবে দেখাতে পারবেন।

অন্যদিকে, সম্পত্তি বিক্রেতার ক্ষেত্রেও একই সুযোগ রাখা হয়েছে। তিনি যদি দলিলে দেখানো মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ পেয়ে থাকেন, তাহলে ওই অতিরিক্ত অর্থের ওপর মূলধনী মুনাফার জন্য নির্ধারিত হারে কর পরিশোধ করে তা বৈধ করতে পারবেন। বর্তমানে এ ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হবে।

তবে করদাতা যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে এই অর্থ ঘোষণা করার আগেই তার বিরুদ্ধে আয়কর আইনের আওতায় অডিট বা তদন্ত শুরু হয়ে যায়, তাহলে তাকে নির্ধারিত করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ২০ শতাংশ কর দিতে হবে।

অর্থবিলে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তার অপ্রদর্শিত বিনিয়োগ, সম্পত্তি ক্রয় বা প্রাপ্ত অর্থ ঘোষণা করে প্রযোজ্য কর পরিশোধ করলে সেই অর্থের উৎস নিয়ে পরবর্তীতে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না।

তবে এই সুবিধা সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। যদি কোনো ব্যক্তি আগে থেকেই আদালতে বিচারাধীন কোনো মামলার আসামি হন বা কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারবেন না।

এছাড়া অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করতে হলে আয়কর রিটার্নে জীবনযাপন ব্যয়ের বিবরণী এবং উৎসে কর কর্তনের তথ্য উল্লেখ করতে হবে, যাতে কর কর্মকর্তারা বিষয়টি যাচাই করতে পারেন।

বাজেট ঘোষণার পরপরই অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে এ বিধানের সমালোচনা করা হয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, এ ধরনের সুযোগ কর-নৈতিকতার পরিপন্থী এবং এটি সৎ করদাতাদের প্রতি অবিচার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সমালোচকদের মতে, যেসব ব্যক্তি দীর্ঘদিন প্রকৃত আয় বা সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন, তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ রাখা হলে কর ব্যবস্থায় বৈষম্য তৈরি হয় এবং নিয়মিত করদাতারা নিরুৎসাহিত হন। 

অর্থমন্ত্রীর ব্যাখ্যা

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সমস্যার মূল কারণ হলো সম্পত্তির সরকারি মূল্য বা মৌজা রেট এবং বাজারমূল্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধান।

তিনি জানান, সারা দেশে মৌজাভিত্তিক সম্পত্তির মূল্য পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি কমিটি ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে।

অর্থমন্ত্রীর মতে, বর্তমানে অনেক এলাকায় সরকারি নির্ধারিত মূল্য বাস্তব বাজারদরের তুলনায় অনেক কম। ফলে দলিলে কম মূল্য দেখানোর প্রবণতা তৈরি হয় এবং সেখান থেকেই অপ্রদর্শিত অর্থের সমস্যা সৃষ্টি হয়।

তিনি বলেন, মৌজা রেটকে বাস্তব বাজারমূল্যের কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারলে ভবিষ্যতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।

সরকারের দাবি, এটি প্রচলিত অর্থে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নয়; বরং সম্পত্তি কেনাবেচার ক্ষেত্রে দলিলমূল্য ও প্রকৃত মূল্যের পার্থক্য থেকে সৃষ্ট কর-জটিলতা নিরসনের একটি ব্যবস্থা। তবে সমালোচকদের মতে, অপ্রদর্শিত অর্থের ওপর নির্দিষ্ট কর দিয়ে বৈধতা পাওয়ার সুযোগ কার্যত কালো টাকা সাদা করারই একটি রূপ। ফলে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে এবং সংসদে অর্থবিল পাসের আগে এ নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে।

কালের সমাজ/ এএইচবি 

Link copied!