ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালকে ঘিরে এবার দেখা গেছে বিশাল টিকিট উন্মাদনা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফাইনালকে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ক্রীড়া ইভেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। যেখানে শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা ও লামিনে ইয়ামালের স্পেন। বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় শুরু হবে দুই দলের মহারণ।
বিশ্বকাপে টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম নিয়েও দর্শকদের আগ্রহে কোনো ভাটা পড়েনি। বরং রেকর্ড দামে টিকিট কিনে মাঠে উপস্থিত হয়েছেন হাজারো সমর্থক। ফলে টিকিট বিক্রি নিয়ে ফিফার নেওয়া কৌশল সফল হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
টিকিট বিশেষজ্ঞ এবং এনবিএ ক্লাব ক্লিভল্যান্ড ক্যাভালিয়ার্সের সাবেক কর্মকর্তা স্কট ফ্রিডম্যান বলেন, ‘ফিফা চাহিদা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পেরেছিল। ১০৪টি ম্যাচের প্রায় সবগুলোতেই দর্শকরা অবিশ্বাস্য দামে টিকিট কিনেছেন।’
ফিফার তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপ পর্বে স্টেডিয়ামের ৯৯.৭ শতাংশ আসন পূর্ণ ছিল। রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭২টি গ্রুপ ম্যাচের অর্ধেকেরও বেশি ছিল পুরোপুরি হাউসফুল। বাকি ম্যাচগুলোর বেশিরভাগেই মাত্র কয়েকশ আসন খালি ছিল।
টুর্নামেন্টের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের ম্যাচে কিছু খালি আসন দেখা যাওয়ায় টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়ে সমালোচনা উঠেছিল। তবে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে দর্শক উপস্থিতি সেই শঙ্কা দূর করে দেয়।
এবার প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিশ্বকাপের প্রতি আগ্রহও বেড়েছে। গ্রুপ পর্বের টিকিটের প্রাথমিক মূল্য ছিল ৫৭৫ মার্কিন ডলার, যা ২০২২ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ মূল্যের টিকিটেরও দ্বিগুণের বেশি। তবে ফিফার ডাইনামিক প্রাইসিং পদ্ধতির কারণে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকিটের দামও বেড়েছে।
ফাইনালের কয়েকশ টিকিট সপ্তাহের শুরুতে ৭ হাজার ডলারের কিছু বেশি দামে পাওয়া গেলেও শুক্রবার ফিফার প্ল্যাটফর্মে হাতে গোনা কয়েকটি টিকিট অবশিষ্ট ছিল। সেগুলোর মূল্য পৌঁছে যায় প্রায় ৩২ হাজার মার্কিন ডলারে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক অ্যাডাম এলমাখতুব বলেন, ‘ডাইনামিক প্রাইসিং নতুন কিছু নয়। তবে এত বড় আসরের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা থাকলে সমর্থকদের জন্য তা ইতিবাচক হতো।’
মাঠের পারফরম্যান্সও দর্শকদের আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চারটি দল এবার সেমিফাইনালে উঠেছে, আর অনেকের ধারণা এটি হতে পারে লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে টিকিট রিসেল করার সুযোগ থাকায় দাম আরও বাড়িয়ে দেয়। টিকিট বিক্রয় প্রতিষ্ঠান সিটগিকের তথ্য অনুযায়ী, ফাইনালের পুনর্বিক্রয় বাজারে একটি টিকিটের গড় মূল্য ১১ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি। যা ২০২৪ সালের সুপার বোলের গড় মূল্যের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। ফলে এটি ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ইভেন্টে পরিণত হয়েছে।
তবে টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি সমালোচনাও রয়েছে। স্পোর্ট অ্যান্ড রাইটস অ্যালায়েন্স জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশের অনেক সমর্থক ভিসা জটিলতায় যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেননি। একই সঙ্গে টিকিটের অতিরিক্ত দামও সাধারণ দর্শকদের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপের নির্বাহী পরিচালক রোনান ইভাইন বলেন, ‘এটি মূলত ধনী সমর্থকদের বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও ব্যয়বহুল টিকিট কেনার সামর্থ্য যাদের ছিল, তারাই বেশি সুবিধা পেয়েছেন।’
সমালোচনা থাকলেও ফিফার দৃষ্টিতে এবারের বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে, রেকর্ড পরিমাণ টিকিটের দাম হলেও বিশ্বকাপ ঘিরে বিশ্বজুড়ে সমর্থকদের আগ্রহ ও চাহিদা এখনও আগের মতোই শক্তিশালী।
কালের সমাজ/এসআর

