হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, যুদ্ধের আগে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি যে অবস্থায় ছিল, সেখানে আর ফিরে যাওয়া হবে না। তেহরানের পক্ষ থেকে এমন সময় এ ঘোষণা এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের সঙ্গে দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা প্রকাশ করেছেন।
আল জাজিরা জানিয়েছে, রোববার (২ আগস্ট) টেলিগ্রামে দেয়া এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, তেহরান ও মাসকাটের মধ্যে চলমান আলোচনা ‘চূড়ান্ত হওয়ার পথে’ রয়েছে বলে মন্ত্রিসভার কাছে দেয়া এক প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, হরমুজ প্রণালিতে বিদ্যমান নৌপথের বাইরে নতুন একটি সামুদ্রিক রুট নিয়ে তেহরান ও মাসকাট সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি রুট নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে যাচ্ছি, যা উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এটি উত্তর বা দক্ষিণ— কোনও বিদ্যমান রুট হবে না। বরং এমন একটি পথ হবে, যা উভয় দেশের সার্বভৌম অধিকারকে সম্মান করবে এবং আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।’
তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনও মন্তব্য করেনি ওমান। মূলত হরমুজ প্রণালির দুই পাশেই ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমা রয়েছে। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশই সাধারণত এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
আল জাজিরা বলছে, হরমুজ প্রণালির নতুন রুটের বিস্তারিত এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরান এই প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছিল।
অবশ্য গত জুনে যুদ্ধবিরতি হলেও হরমুজ প্রণালির নৌপথ নিয়ে বিরোধের জেরে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা ভেঙে পড়ে। এরপর জুলাইয়ে আবারও সংঘাত শুরু হয়।
এর আগে ইসমাইল বাঘাই বলেছিলেন, ইরান ও ওমানের মধ্যে নতুন নৌপথ নিয়ে সমঝোতার সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খোলা বা বন্ধ থাকার কোনও সম্পর্ক নেই। ইরানের বার্তাসংস্থা ফার্সের উদ্ধৃতিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকেই প্রণালিটি বন্ধ হওয়ার জন্য দায়ী করেন।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে, ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ দিয়েছে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে নানা বৈরী পদক্ষেপ নিয়েছে। এ কারণেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা হয়েছে।’
এদিকে রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ভবিষ্যতে তেহরানের পররাষ্ট্রনীতির ‘ভিত্তিপ্রস্তর’ হবে। এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘প্রতিপক্ষ যে চুক্তিতে সই করেছে তা যেন তারা মেনে চলে, সে জন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে। এই সমঝোতা স্মারক আমাদের দেশ, অঞ্চল এবং আমাদের মিত্রদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করবে।’
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র হাসসাম গাশঘাভি বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা জুন মাসের সমঝোতা স্মারকটি আবার কার্যকর করার চেষ্টা করছেন এবং তারা জানেন, হরমুজ প্রণালিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইরানের সংবাদমাধ্যম এসএনএন এ তথ্য জানিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে আবারও একটি ইরানি প্রতিনিধিদল মাসকাট সফর করতে পারে। তার ভাষায়, ‘কূটনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই এটি। মতবিনিময় নিয়মিতভাবেই চলছে।’
এর আগে রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, দীর্ঘ কয়েক মাসের সংঘাত দ্রুত শেষ করার মতো একটি চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলা থেকে বিরত থাকবে।
ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান করছে’, তবে তেহরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ তাকে নতুন হামলা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেছে।
তিনি লেখেন, ‘এই অনুরোধের ভিত্তিতে বিশ্বের ভবিষ্যৎ কল্যাণ এবং একই সঙ্গে সফল ও সমৃদ্ধভাবে ইরানের টিকে থাকার স্বার্থে আমি হামলা বাতিল করতে সম্মত হয়েছি। তবে শর্ত হলো, দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।’
ট্রাম্প আরও বলেন, সম্ভাব্য ওই চুক্তির মধ্যে হরমুজ প্রণালি তাৎক্ষণিক, সম্পূর্ণ ও পুরোপুরি খুলে দেয়া এবং ইরানের পারমাণবিক হুমকির অবসান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তিনি আরও লেখেন, ‘ইসরায়েলও এ প্রতিশ্রুতিতে আমার সঙ্গে রয়েছে। সবাই কাজে নেমে পড়ুন এবং এটি সম্পন্ন করুন।’
এদিকে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত শনিবার ফোনে ট্রাম্পকে উত্তেজনা না বাড়িয়ে সংলাপকে অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে জানিয়েছে সৌদি প্রেস এজেন্সি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের নতুন হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্পের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তাকে এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তৌহিদ আসাদি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একদিকে আবারও সংঘাতের সম্ভাবনার কথা বলছেন, অন্যদিকে আলোচনায় অগ্রগতি এবং সমঝোতার সম্ভাবনার কথাও বলছেন। ইরান বহুদিন ধরেই এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বার্তার সঙ্গে পরিচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘একইভাবে ইরানও দুই ধরনের বার্তা দিচ্ছে। একদিকে কূটনীতির পথ খোলা রয়েছে বলে জানাচ্ছে, অন্যদিকে যেকোনও নতুন সংঘাতের জন্যও পুরোপুরি প্রস্তুত থাকার কথা বলছে।’
কালের সমাজ/এসআর

