রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ সামলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহের প্রভাবে দেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেগেটিভ’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করেছে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা মুডি’স রেটিংস।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত সর্বশেষ মূল্যায়নে নিউইয়র্কভিত্তিক সংস্থাটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ‘ইস্যুয়ার’ ও ‘সিনিয়র আনসিকিউরড’ রেটিং ‘বি২’ অপরিবর্তিত রেখেছে। একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি ইস্যুয়ার রেটিংও ‘নট প্রাইম’ রাখা হয়েছে।
মুডি’সের মতে, ‘বি২’ রেটিংয়ের ক্ষেত্রে আগে যেসব ঝুঁকির কারণে পূর্বাভাস নেতিবাচক করা হয়েছিল, সেগুলোর ভারসাম্য এখন অনেকটাই ফিরে এসেছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং নতুন সরকারের প্রতি শক্তিশালী গণরায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সংস্কার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা কমিয়েছে। পাশাপাশি নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা ও রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় বাড়তি জ্বালানি আমদানি ব্যয় মোকাবিলা করাও তুলনামূলক সহজ হয়েছে বলে মনে করছে মুডি’স। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের ধারাবাহিক যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা অর্থায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে কাজ করছে।
মুডি’সের হিসাবে, ২০২৪ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে তা বেড়ে প্রায় ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই রিজার্ভ দিয়ে চার মাসেরও বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে উন্নতির পূর্বাভাস দিয়েছে মুডি’স। তাদের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে।
তবে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছে সংস্থাটি। মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে আসার আগে তা প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে।
অন্যদিকে, পূর্বাভাসে উন্নতি হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় দুর্বলতা হিসেবে সংকুচিত রাজস্ব ভিত্তি এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অবস্থাকে চিহ্নিত করেছে মুডি’স।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সংস্কারের পর পুরো ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ খেলাপি ঋণের চিত্র সামনে এসেছে। ব্যাংকগুলোর মূলধন পুনর্গঠনে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হতে পারে, যা সরকারের বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
তবে আমানত প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে বড় ধরনের তারল্য সংকট নেই। বরং ব্যাংকগুলোর প্রধান সমস্যা হচ্ছে সচ্ছলতা ও পর্যাপ্ত মূলধনের ঘাটতি।
মুডি’স আরও জানিয়েছে, সরকারের আদায় করা রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। যদিও সামগ্রিক সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, সংকীর্ণ রাজস্ব ভিত্তির কারণে সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তা কমে গেছে।
তবে সহজ শর্তে আন্তর্জাতিক ঋণ সুবিধা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের পুনঃঅর্থায়ন-সংক্রান্ত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাটি।
কালের সমাজ/কে.পি

