ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩
এক ম্যাচে ফুটবলের সব নাটকীয়তা

মেক্সিকোকে কাঁদিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড

স্পোর্টস ডেস্ক | জুলাই ৬, ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম মেক্সিকোকে কাঁদিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড

মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামে যেন এক ম্যাচে ফুটবলের সব নাটকীয়তাই দেখা গেল। গোল, পাল্টা আক্রমণ, ভিএআরের হস্তক্ষেপ, লাল কার্ড, পেনাল্টি আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই সব মিলিয়ে রোমাঞ্চে ভরা কোয়ার্টার ফাইনালে ১০ জনের ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে হারিয়েছে স্বাগতিক মেক্সিকোকে। দীর্ঘ সময় একজন কম নিয়ে খেলেও অসাধারণ রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা, জুড বেলিংহামের জোড়া গোল এবং হ্যারি কেইনের পেনাল্টি থেকে করা গোলেই সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে থ্রি লায়ন্স।

ম্যাচের শুরু থেকেই গ্যালারিতে ছিল মেক্সিকো সমর্থকদের প্রবল উচ্ছ্বাস। সেই আবহেই আক্রমণাত্মক ফুটবল দিয়ে ম্যাচ শুরু করে স্বাগতিকরা। প্রথম মিনিটেই মোরার মাথার কাছে উঁচু পা তুলে ফাউল করায় ইংল্যান্ডের ডেকলান রাইস হলুদ কার্ড দেখেন। ম্যাচের বাকি সময় তাই বাড়তি সতর্কতা নিয়েই খেলতে হয় তাকে।

শুরুর দিকে বলের দখল এবং আক্রমণ দুই দিকেই এগিয়ে ছিল মেক্সিকো। আলভারাদো, রাউল হিমেনেস ও তরুণ গিলবার্তো মোরাকে ঘিরে একের পর এক আক্রমণ সাজাতে থাকে তারা। ১৫ মিনিটে প্রথম বড় সুযোগও তৈরি হয়। ডান প্রান্ত থেকে আলভারাদোর নিখুঁত ক্রসে শক্তিশালী হেড করেন হিমেনেস। কিন্তু নিচু হয়ে অসাধারণ সেভ করে দলকে রক্ষা করেন ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড।

অন্যদিকে ইংল্যান্ড অপেক্ষা করছিল পাল্টা আক্রমণের সুযোগের। অ্যান্থনি গর্ডনের গতিময় দৌড় মেক্সিকোর রক্ষণকে কয়েকবার অস্বস্তিতে ফেললেও ২৬ মিনিটে তার নেয়া শট সহজেই সামলে নেন গোলরক্ষক র‍্যাঙ্গেল।

প্রথমার্ধের শেষ ১০ মিনিটেই ম্যাচের চিত্র বদলে যায়। ৩৬ মিনিটে পিকফোর্ডের দ্রুত থ্রো থেকে শুরু হওয়া পাল্টা আক্রমণে ডেকলান রাইস বল বাড়ান বুকায়ো সাকার কাছে। ডান দিক থেকে সাকার নিখুঁত ক্রস পেছনের পোস্টে পৌঁছে যায় জুড বেলিংহামের কাছে। ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা ইংলিশ মিডফিল্ডার হেডে বল জালে পাঠিয়ে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন।

মেক্সিকো প্রথম গোলের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই আরও বড় আঘাত হানে ইংল্যান্ড। মাত্র দুই মিনিট পর মাঝমাঠে বল কেড়ে দ্রুত আক্রমণে ওঠেন গর্ডন। তার পাস থেকে বেলিংহাম বল দেন অধিনায়ক হ্যারি কেইনের কাছে। নিজে শট না নিয়ে কেইন নিখুঁতভাবে বল ফিরিয়ে দেন বেলিংহামকে। কাছ থেকে সহজেই নিজের দ্বিতীয় এবং দলের দ্বিতীয় গোল করেন রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার।

May be an image of football, soccer, crowd and text

দুই মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল হজম করলেও হাল ছাড়েনি মেক্সিকো। ৪২ মিনিটে আলভারাদোর ইনসুইং ফ্রি-কিক প্রতিহত হয়ে ছয় গজ বক্সের সামনে হুলিয়ান কুইনোনেসের কাছে এলে জোরালো ভলিতে বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান কমান তিনি। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল কুইনোনেসের চতুর্থ গোল। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপের এক আসরে কোনো মেক্সিকান ফুটবলারের যৌথ সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন তিনি; ১৯৯৮ সালে লুইস হার্নান্দেজও করেছিলেন চার গোল।

গোলের পর আরও চেপে বসে মেক্সিকো। যোগ করা সময়ে রাউল হিমেনেসের হাফ-ভলি অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। এরপর আলভারাদোর আরেকটি দারুণ ক্রস থেকে হিমেনেসের হেড অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন পিকফোর্ড। একেবারে শেষ মুহূর্তে কর্নার থেকে সিজার মন্টেস নিশ্চিত গোলের সুযোগ পেয়েও বেলিংহামের অবিশ্বাস্য ট্যাকলে বঞ্চিত হন। প্রথমার্ধ শেষে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই ড্রেসিংরুমে যায় ইংল্যান্ড।

বিরতির পর বদলি নামিয়ে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে মেক্সিকো। তবে দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম বড় সুযোগ তৈরি করে ইংল্যান্ডই। ৪৯ মিনিটে নিকো ও‍‍`রাইলির নিচু ক্রস ছয় গজ বক্স অতিক্রম করলেও কেইন কিংবা সাকা কেউই বল স্পর্শ করতে পারেননি। একই আক্রমণে ও‍‍`রাইলির ভলি বেলিংহামের গায়ে লেগে পোস্টে আঘাত করে ফিরে আসে।

এরপরই ম্যাচে আসে সবচেয়ে বড় মোড়। ৫২ মিনিটে গালিয়ার্দোর ওপর জারেল কোয়ানসাহর ট্যাকল প্রথমে স্বাভাবিক মনে হলেও ভিএআরের পরামর্শে রিপ্লে দেখে সিদ্ধান্ত বদলান রেফারি। বিপজ্জনক ট্যাকলের কারণে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয় কোয়ানসাহকে। ৫৪ মিনিটে ১০ জনের দলে পরিণত হয় ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে কোয়ানসাহ মাত্র চতুর্থ ফুটবলার হিসেবে লাল কার্ড দেখলেন।

May be an image of soccer, football and text

সংখ্যায় পিছিয়ে পড়েও দারুণ পাল্টা আক্রমণ থেকে আবারও গোল পেয়ে যায় ইংল্যান্ড। ৫৮ মিনিটে হ্যারি কেইনের দারুণ হোল্ডআপ প্লের পর গর্ডন দৌড়ে বক্সে ঢুকে পড়েন। তাকে ফাউল করেন গোলরক্ষক র‍্যাঙ্গেল। পেনাল্টি থেকে ৬০ মিনিটে ঠান্ডা মাথায় গোল করে ব্যবধান ৩-১ করেন কেইন।

দুই গোল পিছিয়ে পড়ার পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে মেক্সিকো। কোচ একের পর এক পরিবর্তন এনে সান্তিয়াগো হিমেনেস ও ব্রায়ান গুতিয়েরেসকে মাঠে নামান। তাদের চাপের মুখে আবারও ভিএআরের শরণাপন্ন হন রেফারি। রিপ্লে দেখে ৬৮ মিনিটে সিদ্ধান্ত হয়, গুতিয়েরেসকে ফাউল করেছেন কেইন। পেনাল্টির সিদ্ধান্তে প্রতিবাদ করে হলুদ কার্ড দেখেন মার্ক গেহি।

এক মিনিট পর স্পট কিক থেকে পিকফোর্ডকে ভুল পথে পাঠিয়ে গোল করেন রাউল হিমেনেস। ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৩-২, আর ম্যাচে ফেরে নতুন উত্তেজনা।

এরপর পুরো দল নিয়ে রক্ষণে নেমে যায় ইংল্যান্ড। কোচ টমাস টুখেল একের পর এক রক্ষণাত্মক পরিবর্তন এনে দলকে আরও সংহত করেন। সাকার পরিবর্তে জন স্টোনস, পরে নিকো ও‍‍`রাইলির জায়গায় জেড স্পেন্স এবং এলিয়ট অ্যান্ডারসনের পরিবর্তে ড্যান বার্নকে নামিয়ে রক্ষণকে আরও শক্তিশালী করেন তিনি।

এই পরিবর্তনগুলোই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়। ড্যান বার্ন একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ক্লিয়ারেন্স করেন। জেড স্পেন্স সময়মতো স্লাইড ট্যাকল করে নিশ্চিত গোল বাঁচান। মার্ক গেহিও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হেড ক্লিয়ারেন্সে মেক্সিকোর আক্রমণ ভেস্তে দেন। অন্যদিকে গোলবারের নিচে দুর্দান্ত দৃঢ়তা দেখান পিকফোর্ড।

May be an image of soccer, football and text that says ‍‍`各 14 24 4 24 CUP RLD WO‍‍`

৯০ মিনিট শেষে ১১ মিনিট অতিরিক্ত সময় যোগ হলে ম্যাচের উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। কর্নারের পর কর্নার, ক্রসের পর ক্রস সব অস্ত্রই ব্যবহার করে মেক্সিকো। এক পর্যায়ে থ্রো-ইন নিয়ে প্রতিবাদের কারণে ইয়োহান ভাসকেস এবং সময় নষ্টের অভিযোগে ইংল্যান্ডের বদলি খেলোয়াড় জর্ডান হেন্ডারসন হলুদ কার্ড দেখেন।

শেষ মুহূর্তে মেক্সিকো গোলরক্ষককেও সামনে তুলে আনে। ৯০+১০ মিনিটে কর্নার থেকে বিপজ্জনক বল নিরাপদে তালুবন্দী করেন পিকফোর্ড। ৯০+১২ মিনিটে বক্সের ভেতর তৈরি হওয়া জটলায় জন স্টোনস সময়মতো স্লাইড করে বল ক্লিয়ার করেন। সেটিই ছিল মেক্সিকোর শেষ সুযোগ।

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তির উল্লাসে ফেটে পড়েন ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা। দীর্ঘ সময় ১০ জন নিয়ে খেলেও শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, কার্যকর পাল্টা আক্রমণ এবং বেলিংহাম-কেইনের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় টমাস টুখেলের দল।

কালের সমাজ/এসআর

Link copied!