বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে রাত ২টায় এক মহাকাব্যিক ব্লকবাস্টার লড়াই! বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী- ফ্রান্স এবং মরক্কো।
চার বছর আগের কাতার বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর সেমিফাইনালের স্মৃতি ফিরিয়ে এনে ম্যাচটি আবারও টুর্নামেন্টের অন্যতম হট-ফেভারিট বনাম আফ্রিকান ফুটবলের গর্বের এক জমজমাট লড়াই।
দিদিয়ে দেশমের ফ্রান্স এই মুহূর্তে অপ্রতিরোধ্য ফর্মে রয়েছে। গ্রুপ `আই`-তে শতভাগ জয়ের রেকর্ড গড়ার পর নক-আউটে সুইডেন এবং প্যারাগুয়েকে উড়িয়ে দিয়ে টানা সাত ম্যাচে জয়ের ধারা বজায় রেখেছে `লে ব্লুজ`রা। ৫ ম্যাচে ১৩ গোল করে সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগ এখন ফরাসিদেরই।
বিগত ১২টি প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক ম্যাচের ১১টিতেই জিতেছে তারা। নিউ জার্সিতে এই মাসের শেষের দিকে বিশ্বজয়ের ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরার জন্য তারা কতটা মরিয়া, তা মাঠের পারফরম্যান্সেই স্পষ্ট। অন্যদিকে, মরক্কোও আফ্রিকান ফুটবলের ইতিহাস নতুন করে লিখছে।
২০২২ সালে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠার পর এবার মোহাম্মদ ওয়াহবির দল গ্রুপ `সি` থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নেদারল্যান্ডস ও কানাডাকে বিদায় করে টানা ১০ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড নিয়ে মাঠে নামছে। তবে, ইতিহাস ফরাসীদের পক্ষে; আজ পর্যন্ত স্বাভাবিক সময়ে ফ্রান্সকে হারাতে পারেনি `অ্যাটলাস লায়নস`রা।
ওলিস-এমবাপ্পে বনাম হাকিমি-দিয়াজ: মাঠের লড়াই শুরুর আগেই পরিসংখ্যানের পাতায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন দু’দলের তারকারা। ফরাসি সেনানি মাইকেল ওলিস এবারের বিশ্বকাপে এক অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েছেন।
১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কিংবদন্তি জিকোর পর ওলিসই প্রথম নবাগত খেলোয়াড়, যিনি একই আসরে অন্তত ১০টি ড্রিবল, ১০টি ওপেন-প্লে চান্স এবং ১০টি থ্রু-বল দেয়ার রেকর্ড ছুঁয়েছেন। তার সাথে আছেন এমবাপে, যার নামের পাশে রয়েছে ২টি অ্যাসিস্ট ও ১২টি সুযোগ তৈরির রেকর্ড।
অন্যদিকে আফ্রিকান ফুটবলের ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপে প্রথম ৫ ম্যাচ অপরাজিত থাকার কীর্তি কেবল মরক্কোই দু-দুবার (২০২২ ও ২০২৬) করে দেখিয়েছে। রক্ষণে মরক্কোর বড় ভরসা আশরাফ হাকিমি, যিনি গত দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে যে কোনো ডিফেন্ডারের চেয়ে সর্বোচ্চ ২১টি সুযোগ তৈরি করেছেন।
আর আক্রমণভাগে আছেন ব্রাহিম দিয়াজ, যিনি ২০১৫ সালের আফ্রিকান কাপ অব নেশনস থেকে শুরু করে দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৬টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট নিয়ে সবচেয়ে বিপজ্জনক ফর্মে আছেন।
ইনজুরি জট ও সম্ভাব্য একাদশ: ম্যাচের আগে দু’দলই ইনজুরি নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। ফ্রান্সের মাঝমাঠের চালিকাশক্তি অরেলিয়েন চুয়ামেনি (ঊরুর চোট) খেলা নিয়ে বড় সংশয় থাকলেও কাফ ইনজুরি কাটিয়ে ফিরছেন মার্কাস থুরাম। মরক্কো শিবিরে ইসমায়েল সাইবারির (হ্যামস্ট্রিং) খেলা অনিশ্চিত হলেও হাঁটুর চোট কাটিয়ে ফিরতে পারেন চাদি রিয়াদ।
ফ্রান্সের সম্ভাব্য একাদশ: ম্যাগনান; কুন্দে, উপামেকানো, সালিবা, দিনিয়ে; কোনে, রাবিও; দেম্বেলে, ওলিস, বারকোলা; এমবাপ্পে।
মরক্কোর সম্ভাব্য একাদশ: বুনো; হাকিমি, দিওপ, রিয়াদ, মাজরাউই; এল আয়নায়উই, বুয়াদ্দি; দিয়াজ, ওনাহি, এল খানোস; রাহিমি।
ফুটবল পণ্ডিতদের ভবিষ্যৎবাণী: ফরাসিদের আক্রমণভাগ যতটা শক্তিশালী, ডিফেন্সে তাদের কিছু দুর্বলতাও কিন্তু স্পষ্ট। আর এই কারণেই ম্যাচটি গোলবন্যা আর ওপেন-অ্যাটাকিং ফুটবলের এক দারুণ প্রদর্শনী হতে যাচ্ছে। মরক্কো জানপ্রাণ দিয়ে লড়লেও ফ্রান্সের অতিমানবীয় ফরোয়ার্ড লাইনের সামনে আফ্রিকান ডিফেন্স শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়তে পারে বলেই ফুটবল বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
আর তাই, ফ্রান্স কি জার্মানি ও ব্রাজিলের পর ইতিহাসে টানা তিনবার সেমিফাইনালে ওঠার কীর্তি গড়বে, নাকি মরক্কো কাতার বিশ্বকাপের প্রতিশোধ নিয়ে বোস্টনের মাটিতে নতুন রূপকথা লিখবে, সেটা দেখার অপেক্ষায় পুরো বিশ্ব!
কালের সমাজ/এসআর

