ঢাকা সোমবার, ০৪ মে, ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩

হিজলতলায় ভোরের আলপনা

হাসনাত হান্নান তামিম, মহম্মদপুর (মাগুরা) | মে ৩, ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম হিজলতলায় ভোরের আলপনা

‘হিজল বনে পালিয়ে গেছে পাখি, যতই তারে করুণ কেঁদে ডাকি, দেয় না সাড়া নীরব গহীন বন, বাতাসে তার ব্যথার গুঞ্জরণ।’ মাগুরার মহম্মদপুরের কবি গোলাম মোহাম্মদ-এর কবিতার সেই বিরহী সুর কিংবা জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার চিরচেনা হিজল গাছ আজো আমাদেরকে নস্টালজিয়ায় ভাসায়। আধুনিক নাগরিক সভ্যতার কংক্রিটের ভিড়ে গ্রাম-বাংলার চিরচেনা অনেক বৃক্ষ হারিয়ে গেলেও, মহম্মদপুরের পথে-প্রান্তরে এখনো টিকে আছে হিজলের আদিম সৌন্দর্য। বিশেষ করে গ্রীষ্মের এই তপ্ত ভোরে মহম্মদপুর-মাগুরা সড়কের শ্যামনগর জামে মসজিদের সামনে, ধোয়াইল গ্রামের ছোরন মোল্যার বাড়ির সামনে এবং রাজাপুরের রাজপাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে রাস্তার ধারে দাঁড়ালে দেখা মেলে এই স্বর্গীয় দৃশ্যের।

হিজল ফুলের স্বকীয় শুভ্রতা আর স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই এটি অন্য সব ফুলের থেকে অনন্য। এর জীবনকাল বড় অদ্ভুত। সন্ধ্যার আঁধার ঘনীভূত হওয়ার সাথে সাথে হিজল ডালে প্রাণের স্পন্দন শুরু হয়। যখন সারা পৃথিবী ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন এই নিভৃতচারী হিজলের ফুল ফোটে। ১০-১২ সেন্টিমিটার লম্বা পুষ্পদন্ডের মাঝে অসংখ্য ফুল ঝুমকা লতার মতো ঝুলে থাকে। আর ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই তারা যেন অভিমানে ঝরে পড়ে মাটির বুকে। প্রতিদিন ভোরে শ্যামনগর জামে মসজিদ সংলগ্ন এলাকা, ধোয়াইল গ্রামের ছোরন মোল্যার বাড়ির সামনে এবং রাজাপুরের রাজপাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে রাস্তার ধারে গেলে মনে হয়, কারা যেন পরম মমতায় মাটির উপর এক বিশাল লালচে গালিচা বিছিয়ে রেখেছেন।

এক সময় নদী, নালা ও খালের পাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় অনেক হিজল গাছ দেখা যেত। এখন সেই দৃশ্য বিরল। তবে মহম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় এখনো হিজল গাছ তাদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের এই সময়ে গাছে গাছে বেণিতে ঝোলানো মালার মতো দুলছে হিজল ফুলের লহরি।

রোববার (২৬ এপ্রিল) ফজরের নামাজের পর সরেজমিনে উপজেলা সদরের শ্যামনগর জামে মসজিদের সামনে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে টুপ টুপ করে হিজল ফুল ঝরছে। তখনো গ্রামের নিস্তরঙ্গ জীবনে পুরোপুরি কর্মব্যস্ততা শুরু হয়নি। কিছু মুসল্লী মসজিদ থেকে বেরোচ্ছেন, কেউবা প্রাত:ভ্রমণে বেরিয়েছেন। এই প্রভাতে গাছ থেকে হিজল ফুল ঝরে পড়ার দৃশ্য সত্যিই উপভোগ্য ছিলো। সকাল আটটা নাগাদ গাছের প্রায় সব ফুল ঝরে যায়। ফুল ঝরে পড়ার বিস্ময়কর ও দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য দেখতে হলে কাক ডাকা ভোরে হিজল তলে গিয়ে পৌছতে হবে। ভোরের স্নিগ্ধতা আর বৃন্ত থেকে খসে খসে নিচে পড়ে থাকা ফুলের মোহনীয় মুগ্ধতা মিলেমিশে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে।

স্থানীয় মালিহা ওয়াহিদ মাহিয়া নামের এক শিশুকে হিজল ফুল কুড়াতে দেখা গেলে। সে শ্যামনগর গ্রামের মো. আলী কদর মোল্যার মেয়ে এবং কালীপদ রায় চৌধুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। মাহিয়া প্রায় প্রতিদিন ভোরে এই হিজলতলে ফুল কুড়াতে আসে। পরে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সেই ফুল দিয়ে মালা গাঁথে। এতে তার খুব আনন্দ হয়। এই হিজল গাছটির বয়স শত বছরেরও বেশি বলে স্থানীয়রা জানান।

হিজল কেবল সৌন্দর্যের আধার নয়, এটির রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। হিজল গাছের আদি নিবাস হিসেবে ধরা হয় অস্ট্রেলিয়া, মালয় এবং ভারত-বাংলাদেশ অঞ্চলকে। এর পাতা ডিম্বাকৃতি এবং ডালের শেষ প্রান্তে বেশ ঘনভাবে বিন্যস্ত থাকে। কচি অবস্থায় পাতাগুলো থাকে লালচে, যা সময়ের সাথে সাথে গাঢ় সবুজে রূপ নেয়। বসন্তের শেষ থেকে গ্রীষ্মের পুরোটা সময় হিজলের রাজত্ব চলে। গ্রাম-বাংলার লোকসংস্কৃতিতে হিজল তলার গুরুত্ব অসামান্য ও অপরিসীম।

প্রকৃতির এই অপরূপ দান আজ অস্তিত্ব সংকটে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর বন উজাড়ের কারণে হিজল এখন দুর্লভ বৃক্ষ হয়ে দাড়িয়েছে। তবুও মহম্মদপুরের শ্যামনগর, ধোয়াইল ও রাজপাটের এই হিজল গাছগুলো যেন আমাদের ঐতিহ্যের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতির এই নজরকাড়া রূপ ধরে রাখতে এবং আগামী প্রজন্মের কাছে গ্রাম-বাংলার প্রকৃত রূপ তুলে ধরতে এসব বিলুপ্তপ্রায় বৃক্ষ রক্ষা করা আজ সময়ের দাবি।

ভোরের হাওয়ায় চলতে পথে যখন লালচে হিজল ফুলের উপর দিয়ে মানুষ হেঁটে যায়, তখন মনে হয় প্রকৃতি হয়তো এভাবেই আমাদের প্রতিনিয়ত রঙিন স্বপ্নে বিভোর রাখতে চায়। হিজলের এই মৃদু মিষ্টি গন্ধ আর চোখ জুড়ানো দৃশ্য বেঁচে থাকুক আমাদের যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি মোচনের প্রশান্তি হয়ে।

 

কালের সমাজ/কে.পি

 

Link copied!